ঘটনাটি নওগাঁ জেলার পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম–এর নিজের লেখা একটি নির্মম বাস্তবতা।
গতকাল রাত। ঘড়ির কাঁটা প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। এমন সময় মহাদেবপুর থানাধীন নওহাটা বাজার এলাকা থেকে স্থানীয় সাংবাদিক জনাব জি এম মিঠন ফোন করে পুলিশ সুপারকে জানান—দু’টি শিশু বাচ্চা সেখানে পাওয়া গেছে। বয়স আনুমানিক বারো বা তেরো বছর। আতঙ্কিত কণ্ঠে শিশুরা জানায়, পত্নীতলা এলাকা থেকে মুখ বেঁধে কে বা কারা তাদের এখানে এনে ফেলেছে।
খবরটি শোনামাত্রই পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি নিজেই আবার ফোন করেন। তথ্য যাচাই শেষে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেন—শিশু দু’টিকে নিরাপদে নওহাটা পুলিশ ফাঁড়িতে নিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে মহাদেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জকে অবহিত করা হয়। পুলিশ ভ্যান পাঠিয়ে শিশুদের থানায় নিয়ে আসা হয়।
থানায় কোনো ভয়ভীতি নয়—ভালোবাসা, আদর আর মমতার পরিবেশে তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে শিশুরা। তখনই বেরিয়ে আসে হৃদয়বিদারক সত্য। কেউ তাদের জোর করে আনেনি।
একজনের নাম আরাফাত, অন্যজন রিয়াদ। দু’জনই পত্নীতলার নজিপুর কলোনির বাসিন্দা। বয়স মাত্র বারো-তেরো। তারা বলে—
“আমাদের আম্মুরা পড়াশোনার জন্য খুব বেশি চাপ দেয়। প্রায়ই বকাঝকা, মারধর করে। আমরা ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম… তাই দু’জন মিলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই।”
কোচিংয়ের কথা বলে বিকেলে বাড়ি ছাড়ে তারা। কিন্তু কোচিংয়ে না গিয়ে বাসে করে নওগাঁ শহরে আসে, পরে নওদাপাড়া এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। গভীর রাতে দুই শিশুকে একা ঘুরতে দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। তখনই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বিষয়টি সাংবাদিকের মাধ্যমে পুলিশের কাছে পৌঁছে যায়।
রাতভর সন্তান খুঁজে পাগলপ্রায় মা-বাবারা ছুটে আসেন থানায়। মধ্যরাতে সন্তানদের জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় বুকে জড়িয়ে ধরার সেই মুহূর্ত—কথায় প্রকাশ করা যায় না। কান্না, স্বস্তি আর অপরিসীম কৃতজ্ঞতায় তারা জেলা পুলিশ ও স্থানীয় মানুষের প্রতি ধন্যবাদ জানান।
পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম অভিভাবকদের উদ্দেশে একটাই বার্তা দেন—
ভয় নয়, ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলুন।
কারণ পৃথিবী বদলে গেছে। সময় বদলেছে।
শেখার ধরন, বোঝার ভাষা—সবই বদলেছে।
এই বদলে যাওয়া সময়ে সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের আচরণ না বদলালে ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হয় শিশুরই। অতিরিক্ত চাপ, কঠোরতা আর তুলনা অনেক সময় শিশুদের বাড়ি থেকে পালাতে বাধ্য করে। সেই পালানো পথই অনেককে ঠেলে দেয় অপরাধ, নেশা, পর্নোগ্রাফি কিংবা আত্মহননের মতো ভয়ংকর পরিণতির দিকে।
গতকালই সদর থানায় একটি মামলা হয়েছে—অষ্টম শ্রেণির শিশুদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা, যেখানে ভিকটিমও শিশু, আসামিও শিশু। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটাই আমাদের সমাজের নীরব আর্তনাদ।
তাই সন্তানের জন্য সময় দিন। শুধু নাম্বার নয়—মনটা বুঝুন। শুধু শাসন নয়—বন্ধু হোন।
আজকের শিশুদের সঙ্গে আমাদের এক গভীর জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে। পুরোনো শাসনের ছকে আজকের সন্তানদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে সন্তানদের নৈতিক, সামাজিক ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদেরকেও বদলাতে হবে।
যদি আমরা এখনই না বদলাই— তবে হারিয়ে যাবে আরও অনেক আরাফাত, আরও অনেক রিয়াদ।
আর যদি বদলাই— তবে আগামী প্রজন্ম হবে নিরাপদ, আলোকিত ও মানবিক।

নিউজ ভিশন টুডে ডেস্ক : 


























