শীতের জীর্ণ চাদর সরিয়ে প্রকৃতির বুকে আজ নবজীবনের উল্লাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, হৃদয়ের দুয়ারে দুয়ারে আজ ধ্বনিত হচ্ছে ঋতুরাজের আগমনী। আজ পহেলা ফাল্গুন। কবিগুরু রবীন্দ্র ঠাকুরের-এর সেই চিরঅম্লান আহ্বান— “আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে”—আজ যেন সত্য হয়ে দাঁড়ায় রাঙা শিমুল-পলাশের হাসিতে, কোকিলের কুহুতানে, দখিনা হাওয়ার মৃদু ছোঁয়ায়।
ঝরা পাতার দীর্ঘশ্বাস পেরিয়ে ফাগুন আসে রক্তিম রঙের মিছিল নিয়ে।
পলাশ বলে— জ্বলো!
শিমুল বলে— রাঙাও!
কোকিল বলে— জাগো!
ফাগুন কেবল একটি মাস নয়—
ফাগুন এক অনুভব, এক দ্রোহ, এক প্রেমের দীপ্ত নাম।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, তবু ফাল্গুনের আবেদন অনন্য। দখিনা হাওয়ার এক পশলা ছোঁয়ায় নাগরিক ক্লান্তি ধুয়ে যায়, রুক্ষ প্রকৃতি সেজে ওঠে নতুন সাজে। কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিস্নাত রঙে, শিউলির শুভ্রতায়, পলাশের আগুনে বসন্ত লিখে যায় নবজাগরণের কবিতা।
কিন্তু ফাল্গুনের তাৎপর্য কেবল প্রকৃতির রূপে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসেও ফাল্গুনের রয়েছে অমর অক্ষর। ১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন—২১শে ফেব্রুয়ারি—রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল অকুতোভয় তরুণদের রক্তে। ভাষার অধিকারের দাবিতে প্রাণ দিয়েছিলেন আব্দুল জব্বার, ,রফিক উদ্দিন এর মতো সাহসী সন্তানেরা। তাই ফাগুন আমাদের কাছে কেবল প্রেমের ঋতু নয়, এটি প্রতিবাদের, আত্মত্যাগের, চেতনাজাগরণের মাস।
ফাগুন মানে—
রক্তে লেখা ভাষার গান,
রাঙা পলাশে স্বাধীনতার টান।
যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ত ঘূর্ণিতে যখন আমরা শেকড় ভুলে যাই, ফাল্গুন তখন আমাদের ফিরিয়ে আনে মেলা, গান আর কবিতার আড্ডায়। নতুন করে স্বপ্ন দেখে সংস্কৃতিমনা মানুষ। হৃদয়ের জানালায় লাগে নবপ্রাণের আলো।
বসন্ত আসে আশার বার্তা নিয়ে।
সে বলে—
গ্লানি ঝরাও, বিভেদ ভুলে যাও,
হিংসা পুড়িয়ে নতুন প্রভাতে হাত মেলাও।
দেশের অস্থিরতা দূর হোক, রাজনৈতিক বিভাজন মুছে যাক। দলমত নির্বিশেষে সকলেই দেশের কল্যাণে, মানুষের মঙ্গলে নিবেদিত হোক—এই হোক ফাগুনের অঙ্গীকার।
প্রকৃতির এই নবজাগরণ সঞ্চারিত হোক প্রতিটি হৃদয়ে। ফাগুনের হাওয়ায় দোলা লাগুক আমাদের স্বপ্নে, আমাদের সংকল্পে। রাঙা পলাশের মতো দীপ্ত হয়ে উঠুক আগামী দিনের পথচলা।
এসো, ঋতুরাজ—
তোমার রঙে রাঙাও জীবন,
তোমার সুরে জাগাও মন।
শুভেচ্ছা, ঋতুরাজ বসন্ত! 
লেখক: সাংবাদিক

।। হাসান শাহরিয়ার পল্লব ।। 




















