দীর্ঘ ১৯ মাসের অপেক্ষা, অজানা কষ্ট আর নিঃশেষ আশা—সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নওগাঁ জেলার আত্রাই থানার চাঞ্চল্যকর সুমন হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ।
এ ঘটনায় হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রধান আসামি শাফিউলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পানির ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নিখোঁজ সুমনের হাড়গোড় ও বিচ্ছিন্ন কঙ্কাল।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ২০ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে নওগাঁ জেলার আত্রাই থানাধীন পয়সা গ্রামের বাসিন্দা সুমন (৩৯), পিতা মোঃ শাহাদাত হোসেন, নিজ বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। দীর্ঘ সময় পার হলেও তার কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার।
নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে ২২ জুন ২০২৪ তারিখে আত্রাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৯১১) করা হয়। পরিবার ও পুলিশ যৌথভাবে আশপাশের এলাকায় খোঁজাখুঁজি চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে বাড়ির পাশেই ইটের টুকরার ওপর রক্তের দাগ দেখতে পেয়ে পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় ওই রক্ত ভিকটিম সুমনের বলে নিশ্চিত হয়।
এরপর ভিকটিমের স্ত্রী বাদী হয়ে ১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আত্রাই থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-৪) দায়ের করেন। মামলায় ১৪৩/৩২৬/৩০৭/৩৬৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি নিয়ে শুরু হয় পুলিশের গভীর তদন্ত।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহে ভিকটিমের পরিবার ও স্বজনরা নওগাঁ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গিয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের আবেদন ও বেদনার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পুলিশ সুপার মামলাটি নতুন উদ্যমে তদন্তের নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম), আত্রাই থানার অফিসার ইনচার্জ ও তদন্তকারী কর্মকর্তা আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় পুনরায় তদন্ত শুরু করেন।
তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে প্রধান সন্দেহভাজন শাফিউলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে সে সুমনকে হত্যার কথা স্বীকার করে। জিজ্ঞাসাবাদে শাফিউল জানায়, ভিকটিম সুমন তার স্ত্রীকে কুপ্রস্তাব দেয় এবং হাত ধরে—এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে সে প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পনা করে।
স্বীকারোক্তিতে শাফিউল জানায়, ২২ জুন ২০২৪ রাতে সে ও তার ছোট ভাই সায়েম সুমনকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে আটক করে। পরে গভীর রাতে বাড়ির পাশের একটি নির্জন রাস্তায় নিয়ে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর দুই ভাই মিলে লাশ গুম করতে পাশের একটি নিচু জায়গায় মাটি চাপা দেয়। উল্লেখ্য, অভিযুক্ত শাফিউলের ছোট ভাই সায়েম কয়েক মাস আগে আত্মহত্যা করে।
২৩ জানুয়ারি বিকেলে, আসামির দেখানো মতে পয়সা গ্রামের রমজানের পুকুরের একটি পানির ডোবা সেচে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুলিশ উদ্ধার করে হতভাগা সুমনের হাড়গোড় ও কঙ্কাল। এ সময় ঘটনাস্থলে ভিড় করে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ—অনেকের চোখে ছিল নীরব অশ্রু, অনেকের কণ্ঠে ক্ষোভ।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন,
“নওগাঁ জেলা পুলিশ জেলার যেকোনো অপরাধ উদঘাটন ও দমন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অপরাধী যত সময়ই পার করুক, আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না।”
দীর্ঘ ১৯ মাস পর হলেও সুমনের পরিবারের জন্য এটি বিচারের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া, আর সমাজের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা—অপরাধ চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু সত্য চাপা থাকে না।

স্টাফ রিপোর্টার: 











