ঢাকা ০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জিডি করেও রক্ষা হলো না

ছেলেকে হত্যার মামলা না তোলায় বাবাকে হত্যা?

খুলনার রূপসায় ছেলেকে হত্যার প্রায় দেড় মাস পর গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বাবা আক্তার ঢালীকে। এর আগে ছেলের হত্যা মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তিনি।

জিডিতে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন আক্তার ঢালী। তবে জিডি করার মাত্র ১৭ দিনের মাথায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ গেল তার।

সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার দুর্জনীমহল এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় আক্তার ঢালীকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ছেলের হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে আক্তার ঢালীর ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় করা জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, দুর্জনীমহল এলাকার কয়েকজন তাকে ডেকে নিয়ে ছেলে জয় ঢালী হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দেন। এমনকি তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করেন তিনি।

জিডিতে আক্তার ঢালী আরও উল্লেখ করেন, তার ছেলে জয় ঢালীকে শহিদের মোড় এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় রূপসা থানায় মামলা হওয়ার পর আসামিরা ঢাকার হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তার ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং জানমালের ক্ষতি করার হুমকি দিচ্ছে। এতে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জিডিতে উল্লেখ করেন।

তবে সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। জিডি করার ১৭ দিনের মাথায় বাড়ির সামনে বসে থাকা অবস্থায় গুলিতে নিহত হলেন আক্তার ঢালী।

স্থানীয় ও পরিবারের সদস্যরা আরো জানান, সোমবার সন্ধ্যায় আক্তার ঢালী বাড়ির পাশের একটি বেঞ্চে একা বসে ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন ঘরের ভেতরে ছিলেন। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনে তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে ততক্ষণে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে টর্চলাইটের আলোয় বেঞ্চের পাশে আক্তার ঢালীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। দ্রুত তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের এক ভাতিজি বলেন, ‘চাচা বাসার পাশে বেঞ্চে একা বসে ছিলেন। আমরা ঘরের ভেতরে ছিলাম। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনে বাইরে আসি। রাস্তায় তখন কাউকে দেখা যায়নি। পরে টর্চলাইটের আলোয় চাচাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। এরপর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

হাসপাতাল কর্মী মুরাদ জানান, আক্তার ঢালীর ডান কাঁধ ও গলার অংশে গুলির চিহ্ন রয়েছে। শটগানজাতীয় অস্ত্র থেকে ছররা গুলি ছোড়া হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, ঘটনার সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত এসে আক্তার ঢালীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তবে হামলাকারীদের সংখ্যা, পরিচয় কিংবা হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আনিসুজ্জামান বলেন, কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

এর আগে গত ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী এলাকায় আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে (২৭) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই পরিবারের বাবা-ছেলের পরপর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আক্তার ঢালী আইচগাতী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য ছিলেন। রূপসা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হাসান মল্লিক বলেন, আক্তার ঢালী দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। তার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এবার তাকেও হত্যা করা হলো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তারা আগে থেকেই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

ছেলের হত্যার মামলা তুলে নিতে হুমকি পাওয়ার পর নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছিলেন আক্তার ঢালী। এরপরই একই পরিবারের আরেক সদস্যকে হত্যার ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, ছেলে জয় ঢালীর হত্যা মামলা এবং বাবার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না। সেই সঙ্গে জিডিতে করা অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ট্যাগস

জিডি করেও রক্ষা হলো না

ছেলেকে হত্যার মামলা না তোলায় বাবাকে হত্যা?

আপডেট সময় ০৮:৩৪:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

খুলনার রূপসায় ছেলেকে হত্যার প্রায় দেড় মাস পর গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বাবা আক্তার ঢালীকে। এর আগে ছেলের হত্যা মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তিনি।

জিডিতে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন আক্তার ঢালী। তবে জিডি করার মাত্র ১৭ দিনের মাথায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ গেল তার।

সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার দুর্জনীমহল এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় আক্তার ঢালীকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ছেলের হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে আক্তার ঢালীর ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় করা জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, দুর্জনীমহল এলাকার কয়েকজন তাকে ডেকে নিয়ে ছেলে জয় ঢালী হত্যা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দেন। এমনকি তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে জিডিতে উল্লেখ করেন তিনি।

জিডিতে আক্তার ঢালী আরও উল্লেখ করেন, তার ছেলে জয় ঢালীকে শহিদের মোড় এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় রূপসা থানায় মামলা হওয়ার পর আসামিরা ঢাকার হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তার ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং জানমালের ক্ষতি করার হুমকি দিচ্ছে। এতে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জিডিতে উল্লেখ করেন।

তবে সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। জিডি করার ১৭ দিনের মাথায় বাড়ির সামনে বসে থাকা অবস্থায় গুলিতে নিহত হলেন আক্তার ঢালী।

স্থানীয় ও পরিবারের সদস্যরা আরো জানান, সোমবার সন্ধ্যায় আক্তার ঢালী বাড়ির পাশের একটি বেঞ্চে একা বসে ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন ঘরের ভেতরে ছিলেন। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনে তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে ততক্ষণে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে টর্চলাইটের আলোয় বেঞ্চের পাশে আক্তার ঢালীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। দ্রুত তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের এক ভাতিজি বলেন, ‘চাচা বাসার পাশে বেঞ্চে একা বসে ছিলেন। আমরা ঘরের ভেতরে ছিলাম। হঠাৎ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনে বাইরে আসি। রাস্তায় তখন কাউকে দেখা যায়নি। পরে টর্চলাইটের আলোয় চাচাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখি। এরপর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

হাসপাতাল কর্মী মুরাদ জানান, আক্তার ঢালীর ডান কাঁধ ও গলার অংশে গুলির চিহ্ন রয়েছে। শটগানজাতীয় অস্ত্র থেকে ছররা গুলি ছোড়া হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, ঘটনার সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত এসে আক্তার ঢালীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তবে হামলাকারীদের সংখ্যা, পরিচয় কিংবা হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আনিসুজ্জামান বলেন, কী কারণে এবং কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

এর আগে গত ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী এলাকায় আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে (২৭) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই পরিবারের বাবা-ছেলের পরপর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আক্তার ঢালী আইচগাতী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য ছিলেন। রূপসা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হাসান মল্লিক বলেন, আক্তার ঢালী দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। তার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এবার তাকেও হত্যা করা হলো। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তারা আগে থেকেই প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

ছেলের হত্যার মামলা তুলে নিতে হুমকি পাওয়ার পর নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছিলেন আক্তার ঢালী। এরপরই একই পরিবারের আরেক সদস্যকে হত্যার ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, ছেলে জয় ঢালীর হত্যা মামলা এবং বাবার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না। সেই সঙ্গে জিডিতে করা অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।